বিদায়ী ২০২৫ সাল

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে নীতিগত টানাপড়েনের বছর

একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার লক্ষ্য।

একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার লক্ষ্য। বিদায়ী ২০২৫ সালের প্রায় পুরো সময়েই বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মুদ্রানীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ দুয়ের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছিল ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ ও বাণিজ্য বিবাদ। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যপূরণের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন তারা। তবে বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, জাপান বাদে উন্নত অর্থনীতির অধিকাংশ দেশই শেষ পর্যন্ত সুদহার কমানোর পথে হেঁটেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালকে বৈশ্বিক মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে সতর্ক কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকবদলের বছর হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। খবর আনাদোলু।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাবাদী বাণিজ্যনীতি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মার্চ-এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেয় এবং অর্থনীতিতে কোনো ধরনের পূর্বাভাস দেয়াকে বেশ চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে মার্কিন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ। এসব দেশই পরে হয়ে ওঠে বাণিজ্য উত্তেজনার প্রধান প্রধান পক্ষ।

বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) একের পর এক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এর মধ্যে পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তোলে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, ভেনিজুয়েলা ও নাইজেরিয়ার ওপর ট্রাম্পের খড়্গহস্ত অবস্থান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থ প্রয়াস। এ অবস্থায় গোটা বিশ্বেই বেশ সতর্ক অবস্থায় বছর শেষ করছে আর্থিক বাজার।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বাজেট নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় গত ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় ফেডারেল শাটডাউন। টানা ৪৩ দিনের এ শাটডাউন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ হিসেবে বিবেচিত এবং বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অর্থনৈতিক তথ্যপ্রবাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটায়।

অর্থনৈতিক ও আর্থিকভাবে তীব্র প্রভাব ফেলতে সক্ষম এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নীতিনির্ধারণে সতর্ক অবস্থান নেয় বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। শুল্কজনিত অনিশ্চয়তা ও শাটডাউনের প্রভাব মূল্যস্ফীতি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয় ফেডের নীতিনির্ধারকদের। ফেড কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার এবং আরো তথ্য পর্যালোচনার কথা বলেন। অন্যরা মত দেন সুদহার কমানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে।

ফেড ২০২৫ সালে তিন দফায় মোট ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সুদহার সীমা নামিয়ে এনেছে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এবং চলতি ডিসেম্বরে প্রতিবার ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফেড। বাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ ও জুলাইয়ে আরো দুই দফায় ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমাতে পারে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকও (ইসিবি) বিদায়ী বছরে তিন দফায় সুদহার মোট ১০০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে। তবে ইসিবির আগামী বছরে সুদহার কমানোর ধারা অব্যাহত রাখার বিষয় খুব একটা আশাবাদী নয় বাজার। গত নভেম্বরে ইউরোজোনে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ২ দশমিক ১ শতাংশে, যা ব্যাংকটির মধ্যমেয়াদি ২ শতাংশ লক্ষ্যের কাছাকাছি। তবে চলতি মাসে ইসিবির শেষ মুদ্রানীতিবিষয়ক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতার কারণে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে ইসিবি সুদহার বাড়াতে পারে।’

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির গতি ফেরাতে চলতি বছর মোট ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কমিয়েছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই)। গত নভেম্বরে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। সে সময় সুদহার দাঁড়িয়েছিল ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে বাড়তি হারের সুদহার বজায় রেখে ব্যাংকটি কঠোর মুদ্রানীতি ধরে রাখে। তবে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যেও আগামী এপ্রিলে বিওই প্রথমবার সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাপানে মূল্যস্ফীতি ও মজুরি স্থায়ীভাবে বাড়ার আশঙ্কায় ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) ২০২৫ সালে মোট ৫০ বেসিস পয়েন্ট সুদহার বাড়িয়েছে। ফলে দেশটিতে সুদহার দাঁড়িয়েছে দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সামনের দিনগুলোয় জাপানে মজুরি ও মূল্য ধীরে ধীরে বাড়বে বলে প্রত্যাশা বিওজের। তবে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় দেশটিতে প্রকৃত সুদহার নেতিবাচক পর্যায়েই থাকবে এবং সহায়ক আর্থিক পরিবেশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

জাপানে গত নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৬ সালে বিওজের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বাজারের ধারণা এখনো বেশ অস্পষ্ট। তবে আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে বিওজে প্রথম দফায় সুদহার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর মোট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সুদহার নামিয়ে আনে ২ দশমিক ৫ শতাংশে। ফেব্রুয়ারি, মে ও আগস্টে তিন দফায় ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে কমিয়ে সুদহার ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া। তবে বাজার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মে মাসে ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার বাড়তে পারে অস্ট্রেলিয়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউজিল্যান্ড চলতি বছর সবচেয়ে বেশি শিথিলতা দেখিয়েছে। সুদহার মোট ২০০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে নিউজিল্যান্ডে সুদহার নামিয়ে আনা হয়েছে ২ দশমিক ২৫ শতাংশে।

আরও